২৭ জানুয়ারি ২০২১

বাংলার দুটি দুর্ভিক্ষ ও প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে

ছিয়াত্তরের মনন্তর

১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে (বাংলায় ১১৭৬ বঙ্গাব্দে)  যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তা বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিল। ১১৭৬ বঙ্গাব্দে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে এর নাম “ছিয়াত্তরের মনন্তর বলা হয়।

এক কথায় দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল ,ইংরেজদের দ্বৈত শাষন নীতি।অর্থাৎ বাংলার নবাবের হাতে ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতা আর ইংরেজদের হাতে ছিল  রাজস্ব নির্ধারণ ও আাদয়ের ক্ষমতা।বাংলার সর্বশেষ  নবাব সিরাজ উদ্দোলাকে (জন্ম-১৭৩৩-মৃত্যু-১৭৫৭) পলাশির যুদ্ধে পরাজিত ও পরবর্তীতে হত্যার পর মীর জাফরকে বাংলার নবাব বানানো হয়।মীর জাফর ইংরেজদের পুতুল হিসাবে দায়িত্বে ছিল কার্যত মীর জাফরের (জন্ম-১৬৯১-মৃত্যু-১৭৬৫) কোন ক্ষমতা ছিল না। ১৭৬০ সালে লর্ড ক্লাইভ (জন্ম-১৭২৫-মৃত্যুঃ১৭৭৪) দেশে ফিরে যান। ইংরেজরা আবার তাকে ফিরিয়ে আনে।ক্লাইভ ফিরে এসে দিল্লির বাদশাহ শাহ আলমের(জন্মঃ১৭২৮-মৃত্যুঃ১৮০৬) থেকে ২৬ লক্ষ সিক্কার বিনিময়ে বাংলা, বিহার,ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে।ইংরেজ সরকার তখন দ্বৈত শাষন নীতি চালু করে।ফলে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পুরোপুরি কোম্পানির হাতে চলে যায়।দুর্ভিক্ষের আগের বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়।কৃষকরা তার কষ্টার্জিত ফসল ঘরে তুলতে পারে না।কিন্তু কোম্পানি তার রাজস্ব আাদায়ে অনড় ছিল।পূর্বের বছরে যত রাজস্ব আদায় করেছিল, কোম্পানি দুর্ভিক্ষের বছরে তার চেয়ে ৫২২০০০ টাকা বেশি আদায় করে।এক দিকে কৃষক তার ফসল ঘরে তুলতে না পারা ও অন্যদিকে কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।এই মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রায় ১ কোটি লোক না খেতে মেরে মারা যায়।


 

পঞ্চাশের মনন্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) জাপান বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) দখল করে নেয়।


তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের পরামর্শে নৌকা, ও গরুর গাড়ি ধ্বংস করে দেয়া হয়।

এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।যাতে জাপানি সৈন্যরা বাংলায় ঢুকতে না পারে।

নদী পথ স্থলপথ অবরুদ্ধ থাকায় উৎপাদিত ফসল এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পরিবহন করা সম্ভব হয় নি।যার ফলে পুরো বাংলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়।দেখা দেয় দুর্ভিক্ষের।অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা জাহাজ ভর্তি চাউল ইংরেজ সরকার ঢুকতে দেয় নি।যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের হাত বাড়াতে চেয়েছিল কিন্তু ইংরেজ সরকার তা গ্রহন করে নি।খাদ্যের অভাব ও ক্ষুধার যন্ত্রণায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে পালাতে থাকে।মা-বাবার সামনে সন্তান ও সন্তানের সামনে মা-বাবা ধুকে ধুকে মৃত্যু বরন করেছে।ইঁদুর বা রাস্তার কুকুর এভাবে মৃত্যু বরন করে না যেভাবে বাঙ্গালীর মৃত্যু হয়েছিল।


বৃটেনে সরকার এই দুর্ভিক্ষের কথা প্রথম দিকে লুকিয়ে রেখেছিলো।যখন মানুষ শহরে এসে একে একে অফিস-আদালত ও বিভিন্ন দূতাবাসের সামনে পড়ে পড়ে মরতে থাকলো তখন বিষয়টা প্রকাশ পায়।মাসহ দুধের শিশুর রাস্তায় পড়ে মরে থাকার দৃশ্য অনেক রাষ্ট্রদূতের নজরে এসেছিলো। কি বিভৎস দৃশ্য! কৃষান চন্দর তার বিখ্যাত “অন্নদাতা” বইয়ে আরো বিস্তারিত লিখেছেন। একটা চাইনিজ পুতুলের দাম ছিল ১০ টাকা অথচ মা তার শিশুকে বিক্রি করতো মাত্র পাঁচ টাকায়। তখন কোলকাতার সোনাগাছিতে নারী কেনা-বেচা হতো। ।মাত্র পাঁচ-ছয় টাকায় নারীরা নিজেকে বিক্রি করে দিত।তবে সুন্দরী হলে আরো দু এক টাকা বেশি পাওয়া যেত।তথচ তখন চালের দাম কেজি প্রতি ছিল দু-তিন টাকা। আমেরিকানরা আফ্রিকা থেকে নিগ্রো দাস কিনতো ৪০ ডলার দিয়ে অথচ বাঙ্গালী দাস মাত্র চার-পাঁচ টাকায় বিক্রি হতো। ধারণা করা হয় এই দুর্ভিক্ষে ২১-২২  লক্ষ লোক মারা যায়।


 তখনো এক শ্রেণীর অমানুষের দল শহরের হোটেল গুলোতে নারী নিয়ে ফূর্তি করেছে।ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না “একটু ফেন দাও মা” আর্তনাদ  ঐসকল নরপশুদের কান পর্যন্ত  পৌছায় নি। কি নির্মম গণহত্যা!  আমি একে গনহত্যা বলব এই কারনে যে, ইংরেজ সরকার ও তার প্রশাসন চাইলে এসকল দুর্ভিক্ষের কবলে বাঙালীদের পড়তে হতো না।

 

 

আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ সকল দুর্ভিক্ষ, দূর্যোগ, অভাব, অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন-যাপন করেছে। বিলাসিতার অভাব থাকতে পারে তবে আজ  আমাদের খাবারের অভাব নেই। তাই আমরা তাদের ব্যাথা বুঝতে পারব না।আহ! জীবন কত কষ্টের!  আবার কতো সুখের!