২১ জানুয়ারি ২০২১

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে মাদ্রাসা সূত্রপাত ও অতিত ইতিহাস

প্রথম মাদরাসা  কোনটি?

 রাসূল (সাঃ) যখন  নবুওয়াত প্রাপ্ত হউন।তখন জায়েদ বিন আকরামের নিজস্ব সম্পত্তি “সাফা” নামক স্থানে সাহাবাদের কোরআন,তাজবীদ, হাদীস, ক্যালিগ্রাফি (হাতের লেখা), খেলাধূলা, ঘোড়া চালানো সেখানো হতো।

যখন মোহাম্মদ (সাঃ) মদিনায় হিজরত করলেন তখন  আল-মসজিদ আন নববীর পূর্ব পাশে বিভিন্ন বিষয়ে   শিক্ষা প্রদান চলতে থাকে উবাদা ইবনে আস-সামিত সর্বপ্রথম ছাত্রদের মধ্যে শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হয়।


সম্পদশালী বণিক মোহাম্মদ  আল ফিহরির মেয়ে ফাতেমা আল ফিহরি ৮৫৯ সালে বর্তমান মরক্কো( পূর্বে  ফিজ) আল- কারয়িন  মসজিদ ও একইসাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রুপান্তরিত করা হয়।আর এটি হচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে পুরনো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ।তারই আদলে ৯৬৯-৯৭০ সালে মিসরের কায়রোতে আল-আজহার মসজিদ ও মাদ্রাসা  ( বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়) নির্মিত হয়।প্রাক ইসলামি যুগে মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ অভিন্ন ছিল।এছাড়া জানা-অজানা অনেক ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল সেসময়।যেমন ইরাকের বাগদাদে আল-মুস্তানসিরা মাদরাসা ১২২৭ সালে ও এছাড়া তুরস্কের এরজুরুমে ১৩ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কিফতি মিনারেলি মাদরাসা তৈরি হয়।


ইবনে সিনা  প্রণীত শিক্ষা কমিশন 

১১ শতাব্দীতে পারস্যের বিখ্যাত ইসলামিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা একটি শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করেন। সেখানে  বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা হবে ৬ বছর থেকে ১৪ বছরের শিক্ষার্থীদের জন্য।এখানে বাচ্চাদের, কোরআন, আরবী, সাহিত্য, নৈতিক ও আদর্শ শিক্ষা, এবং কারিগরী শিক্ষা এবং সাধারণ জ্ঞান ও বিজ্ঞান  যা তার দৈনন্দিন  জীবনে দরকার হয় এমন শিক্ষা দেয়া হবে।

মাধ্যমিক স্তরঃ শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যা শিখবে তার উপর ভিত্তি করে তাদের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নিয়ে মাধ্যমিকে পড়বে। এমন বিষয়গুলো বেছে নেবে যা তার বাস্তব জীবনে কাজে লাগবে।যেমন জ্যামিতি, রসায়ন, ভৌত বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কারুশিল্প, বানিজ্য, কোরআন, হাদীস, ফিকাহ, দর্শন ইত্যাদি।
 
পরবর্তীতে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থা আরো উন্নত করা হয় সেখানে ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, আলোক বিজ্ঞান ,অংকসহ অন্যান্য বিষয়গুলো
অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নবম শতাব্দীতে আল-কারওয়ায়িন, দশম শতাব্দীতে আল-আজহার
বিশ্ববিদ্যালয়, একাদশ শতাব্দীতে “নিজামিয়া” বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখিত বিষয়গুলো পড়ানো হতো।১১৫৫-১২৬০ সালের মধ্যে মিসরের কায়রোতে ৭৫ টি, দামেস্ক শহরে ৫১ টি, আলেপ্পা শহরে ৪৪ টি মাদরাসা ছিল বলে জানা যায়।কুরতুবি শাসনামলের সময় (৭৫৬-৯২৯) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মাদরাসা শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে।
 
১৫ শতাব্দীতে দামেস্ক শহরে ১৫৫ টি মাদরাসা ছিল যার মধ্যে ৩টি মেডিকেল কলেজ ছিল বলে জানা যায়। অটোমান শাসনামলে সুলতান সুলেমান এর সময় মেডিসিন এর উপর মাদরাসাগুলোতে শিক্ষা দেয়া হতো।
 

বাংলায় প্রথম মাদরাসা


বাঙ্গালী মুসলিমরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল।ব্রিটিশ শাসনামলে(১৭৫৭-১৯৪৭) ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতায় মুসলিমদের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথম কলকাতা আলিয়া  মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।কলকাতা আলিয়া মাদরাসার আদলে ১৭৮০ সালে বকশীবাজার, ঢাকাতে বাংলাদেশে প্রথম “ঢাকা আলিয়া মাদরাসা “নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়।
 
 



প্রথম কওমী মাদরাসা


১৮৬৬ সালে উত্তর প্রদেশের শাহারানপুর জেলার দেওবন্দে “দারুল উলুম দেওবন্দ” মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।মোহাম্মদ কাশেম নানাতুবী ও মোহাম্মদ দেওবন্দ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
এই দেওবন্দ মাদরাসার অনুকরণে ১৮৯৬ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী  “আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল  উলুম মুঈনুল ইসলাম” মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।
জনাব হাবিবুল্লাহ, জনাব আজিজুর রহমান, জনাব, আব্দুল হামিদ, জনাব  আবদুল ওয়াহেদসহ অন্যান্য আলেমগন মিলে মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত করেন।
 
এবার আসি মোদ্দাকথায়, আমার কাছে মনে হয়েছে ইবনে সিনা যে শিক্ষা ব্যবস্থা  চালু করেছিল সেটা ছিল আধুনিক আর যুগোপযোগী। কারন তিনি ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।সময়োপযোগী আদর্শ শিক্ষা বাস্তবিক বিজ্ঞান শিক্ষার ফলে একজন মানুষ যেমন সৎ ও আদর্শবান হতে পারে তেমনি একটি রাষ্ট্রও উন্নত হতে পারে।পবিত্র  কোরআনে বিজ্ঞান বিষয়ক এমন অনেক আয়াত রয়েছে ।আমাদের শিক্ষক দরকার, চিকিৎসক দরকার, বিজ্ঞানী দরকার। ইসলাম বিজ্ঞান শিক্ষার বিরুদ্ধে নয় বরং পক্ষে। মহান সৃষ্টিকর্তা কত বিশাল মাহাকাশ তৈরি করেছেন সেগুলো আমাদের জানতে হবে আর জানতে হলে গবেষণা করতে হবে। একমাত্র বিজ্ঞান শিক্ষা পারে এই সুবিশাল পৃথিবী আর অন্তত-অসীম মহাকাশ সম্পর্কে সঠিক ধারনা  দিতে।
তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আদর্শ শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা দরকার।সৃষ্টিকর্তাকে জানতে ও বুঝতে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প নেই। কারন বিজ্ঞান ছাড়া আমরা এক ইঞ্চিও চলতে পারব না।