কে এই জেবুন্নেসা?
জেব্- উন-নেসা একজন মুসলিম নারী কবি ও মোঘল রাজকন্যা। জেব্-উন-নেসা ছিল মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মেয়ে। দিলারা বানু ছিল জেব্-উন-নেসার গর্ভধারণী মা। জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৬৩৮দৌলতাবাদ এবং মৃত্যু ২৬ মে ১৭০২ আগরায়।
তৎকালীন রাজকন্যাদের মধ্যে জেবুন্নেসা অত্যন্ত বিচক্ষণ, মেধাবী ও দূরদর্শী জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কবি হাফিজা মরিয়ম নামে এক মহিলা জেবুন্নেসা ও তার বড় বোন -----কোরআন শিখিয়েছিলেন। জেবুন্নেসা এতোটা মেধাবী ছিলো যে মাত্র সাত বছর বয়সে সম্পূর্ণ কোরআন হেফজ করে ফেলেছিলো।এই খুশিতে তার পিতা আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রীয়ভাবে দু'দিনের ছুটি ও ৩০০০০ মোহর দান করেছিল।সে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা,দর্শন, ভাষা (উর্দু, ফারসি, আরবী) ও ক্যালিগ্রাফিতে পারদর্শী ছিল। জেবুন্নেসা মার্জিত পোষাক পড়ত। এক তুর্কী নারীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সে এক ধরনের পোষাক (Angya Kurti নামে) পড়ত যা এখনো অনেকে পড়ে।
তার উস্তাদ বায়াজ এর অনুপ্রেরণায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে জেবুন্নেসা পার্সিয়ান কবিতা লেখা শুরু করে। আওরঙ্গজেবের মহলে বিখ্যাত গায়ক-কবিদের সাহিত্য ও কবিতা আড্ডা হতো।আব্দুল কাদির বেদিল,সায়েব তাবরিজি, ঘানি কাশ্মীরি,নিয়ামাতুল্লাহ খান, আকিল খানের মতো বিখ্যাত কবিদের সাথে জেবুন্নেসা সাহিত্য আড্ডায় বসতো।
জেবুন্নেসা মানব দরদী ও মানবতাবাদী ছিলো।ধর্ম- কর্ম কেমন মানতো তা তেমন জানা যায় না।তবে সে গরিবদের কথা লিখতেন যেমন লিখেছেন
আমি আওরঙ্গজেব এর কন্যা
রাজকন্যা জেব্-উন-নেসা
আমার চোখে দারিদ্র
তার বিখ্যাত বই দেওয়ানী-ই-মাখফী।তিনি আরো লিখেছেন দিওয়ান(যাতে ৫০০০ পঙক্তি রয়েছে), মনিস-উল-রুহ,জেব-উল-মনসাত,জেব-উল-তাফসির,এবং ১৫০০০ পংক্তির বিশাল বই মাখজান-উল-ঘাইব।বলাবাহুল্য জেব্-উন-নেসা হাফিজ সিরাজীর অনুকরণে পদ্য লিখতো।
জেবুন্নেসার বিয়ে
শাহজাহান তার বড় পুত্র দারা শিখোর ছেলে রাজকুমার সোলাইমান শিখোর সাথে জেবুন্নেসার বিয়ের কথা বলেছিল। কারন, সোলাইমান শিখো ছিল শাহজাহানের পরবর্তী সিংহাসনের দাবীদার। কিন্তু আওরঙ্গজেব তার বড় ভাইয়ের ছেলে সোলাইমান শিখোর সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয় নি। ফলে জেবুন্নেসার সাথে তার চাচাতো ভাই সোলাইমান শিখোর বিয়ে হয় নি।আওরঙ্গজেব সোলেমান শিখোকে বিশ্বাস ঘাতক ট্যাগ দিয়ে গ্রেপ্তার করে ও নিয়মিত বিশ প্রয়োগ করতে থাকে যাতে পাগলামি আচরণ করতে থাকে।কিন্তু এতেও কাজ না হলে আওরঙ্গজেব তাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে।
আওরঙ্গজেব যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন তিনি তার পরিবার নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে লাহরে চলে যান।সেই সময় লাহরের গভর্নর ছিল আকিল খান।কথিত আছে আকিল খানের সাথে জেবুন্নেসার দৈহিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল।তবে একথার তেমন সত্যতা মেলে না।
ইরানের দ্বিতীয় বাদশাহ শাহ আব্বাস এর পুত্র মির্জা ফারুখ তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু জেবুন্নেসা বলেছিল বিয়ের আগে রাজপুত্রদের দেখতে ও বুঝতে চান।পরে বিয়েটা আর হয় নি।
শিবাজি ও জেবুন্নেসার প্রেম কাহিনী
আরো কথিত আছে জেব্-উন-নেসা মহারাষ্ট্রের মারাঠি রাজা ও যোদ্ধা শিবাজি মহারাজের প্রেমে পড়েছিলেন।
শিবাজি আওরঙ্গজেব এর চাচা শায়েস্তা খানের হেরেমে আক্রমণ করে এবং এতে শায়েস্তা খানের ছেলে মারা যায়।পরবর্তীতে জেবুন্নেসা মোঘল হেরেমে আওরঙ্গজেব এর সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেন শিবাজি হেরেমে আসেন আর জেবুন্নেসা তার প্রেমে পড়ে।৩৯ বছর বয়সী শিবাজিকে তার ধর্ম ত্যাগ করে ২৭ বছর বয়সী জেবুন্নেসার সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল । শিবাজি এতে রাজি হয় নি এই কারনে জেব্-উন-নেসা সারা জীবন অবিবাহিত থেকে গেছেন।তবে অনেকে বলে এটা সত্য নয়।এটা মানুষের মুখে মুখে বলা গাল গল্প।তবে সত্য এই যে, আওরঙ্গজেব শিবাজি মহারাজার নাতি ছেলে শাহুকে যখন আটক করে বন্দী করে তখন জেব্-উন-নেসা শাহুর দিকে দয়া ও সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, শিবাজির ছেলে রাজারাম যখন ফুসফুসের রোগে মারা যায় জেব্-উন-নেসা তখন শিবাজিকে শান্তনা দিয়েছিল।
শেষ কথা
জেবুন্নেসা আর দশটা রাজকন্যাদের মত ছিলো না।সে জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীলা ছিলো।
